"উনাভাতে দুনা বল, বেশী ভাতে রসাতল": সুস্থতার প্রাচীন দর্শন— মোঃ শাহাদৎ হোসেনআমাদের প্রাচীণ সমাজ জীবন ও স্বাস্থ্যের এক গভীর রহস্য উন্মোচন করে একটি প্রবাদ, যা আজও সমান প্রাসঙ্গিক: "উনাভাতে দুনা বল, বেশী ভাতে রসাতল।" এর মর্মার্থ হলো—পেটে এক অংশ খালি রেখে পরিমিত খাদ্য গ্রহণ করলে (উনাভাতে) শরীর দ্বিগুণ শক্তি (দুনা বল) লাভ করে। অন্যদিকে, পেট ভরে অতিরিক্ত খাদ্য খেলে শরীর দুর্বল হয়ে রসাতলে যায়। এই প্রবাদটি কেবল লোককথা নয়, বরং এটি স্বাস্থ্য, শারীরিক কর্মক্ষমতা ও মানসিক মনোযোগের এক অব্যর্থ জীবন দর্শন।প্রবাদটির মূল জিজ্ঞাসা: খাদ্য কম খেলে শক্তি বেশি বাড়ে—এই আপাতবিরোধী ধারণাটি কীভাবে আমাদের জীবনের জন্য সত্য হয়? নিচে এর বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক আলোচনা করা হলো।১. উনাভাতে দুনা বল: পরিমিত ভোজনের বিজ্ঞানপেট ভরে খাওয়ার পর ক্লান্তি, আলস্য ও তন্দ্রাচ্ছন্নতা আসে—এটি আমাদের প্রায় সবারই পরিচিত অভিজ্ঞতা। এর বিপরীতে, 'উনাভাতে' অর্থাৎ পেটে খানিকটা খালি রেখে খেলে শরীর সতেজ থাকে। এর পেছনের কারণগুলো হলো:সংরক্ষিত শক্তি ও কার্যক্ষমতা: যখন আমরা অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ করি, হজম প্রক্রিয়ার জন্য শরীরকে বিপুল পরিমাণ রক্ত ও শক্তি পাকস্থলী ও অন্ত্রের দিকে চালিত করতে হয়। ফলস্বরূপ, মস্তিষ্ক ও পেশীতে পৌঁছানো রক্তের পরিমাণ কমে যায়, যা ক্লান্তি ও অলসতা সৃষ্টি করে। পরিমিত খাদ্য গ্রহণে (যেমন ইসলাম ধর্মে বর্ণিত: পেটের $1/3$ অংশ খাদ্য, $1/3$ অংশ পানীয় এবং $1/3$ অংশ খালি রাখা) হজম দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয়। শরীরকে হজমের জন্য অতিরিক্ত শক্তি ব্যয় করতে হয় না। এই সংরক্ষিত শক্তিই আমাদেরকে কর্মক্ষম ও সতেজ রাখে—এটাই হলো 'দুনা বল'।প্রাচীন জ্ঞান ও অনুমোদন: ভারতীয় প্রাচীন আয়ুর্বেদ ও যোগ দর্শনও এই প্রবাদটির সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। তারা সবসময় লঘু আহার এবং পরিমিত ভোজনের উপর জোর দিয়েছে। পরিমিত খাদ্য মানুষকে 'সাত্ত্বিক' বা সতেজ ও বিশুদ্ধ রাখে বলে তারা বিশ্বাস করতেন।২. বেশী ভাতে রসাতল: অতিরিক্ত ভোজনের ভয়াবহ পরিণতিঅতিরিক্ত খাদ্য বা 'বেশী ভাত' কেবল সাময়িক আলস্য আনে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তিতে শরীরের 'রসাতল' বা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়।স্থূলতা ও অলসতা বৃদ্ধি: অতিরিক্ত ক্যালরি চর্বি হিসেবে জমা হয়ে স্থূলতা তৈরি করে, যা বহু আধুনিক রোগের মূল কারণ। শরীর ভারী হলে স্বাভাবিক নড়াচড়া কঠিন হয়ে পড়ে, যার ফলে অলসতা বৃদ্ধি পায় এবং জীবনের গতি কমে আসে।মারাত্মক রোগের উৎপত্তি: মাত্রাতিরিক্ত ভোজন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং হজম সংক্রান্ত নানা সমস্যার জন্ম দেয়। পরিপাকতন্ত্রকে অতিরিক্ত চাপে রাখলে পুরো দেহের সিস্টেমই ভারসাম্য হারায়।মানসিক মনোযোগের অভাব: পেট অতিরিক্ত ভর্তি থাকলে মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হয়। ভারী হজম প্রক্রিয়া মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে, যার ফলে কোনো কঠিন বা সৃজনশীল কাজে একাগ্রতা (মনোনিবেশ) সৃষ্টি করা কঠিন হয়ে পড়ে।৩. জীবনযাত্রায় মধ্যপন্থা: সুস্থতার চাবিকাঠিএই প্রবাদটি আমাদের জীবনের জন্য একটি সহজ অথচ গভীর পথ বাতলে দেয়—তা হলো মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। আমাদের পরিমিত ভোজনের অভ্যাস গড়ে তোলা আবশ্যক।সচেতন আহার (Mindful Eating): তাড়াহুড়ো করে খাবার না খেয়ে, প্রতিটি লোকমা ধীরে ধীরে চিবিয়ে খাওয়া উচিত। এটি মস্তিষ্ককে পেট ভরে যাওয়ার সংকেত সঠিক সময়ে পেতে সাহায্য করে, ফলে আমরা অতিরিক্ত খাওয়া থেকে সহজেই বিরত থাকতে পারি।গুণগত মানকে প্রাধান্য: পরিমাণের পাশাপাশি খাবারের গুণগত মানের দিকে নজর দিতে হবে, যা অল্প হলেও শরীরকে প্রয়োজনীয় শক্তি, পুষ্টি ও ভিটামিন যোগান দেবে।আমাদের জীবনে কর্ম সম্পাদনের জন্য শক্তির প্রয়োজন। সেই শক্তি যেন খাবার হজম করার পিছনে অতিরিক্ত ব্যয় না হয়, বরং তা শরীর ও মনকে সতেজ রেখে সৃজনশীল ও উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহৃত হতে পারে—এই বার্তাই দেয় প্রবাদটি। তাই আসুন, "উনাভাতে দুনা বল" নীতি মেনে চলি এবং সুস্থ, কর্মঠ ও দীর্ঘ জীবন লাভ করি।