বনের পাখির জন্ম দিচ্ছেন না তো?
মোঃ শাহাদৎ হোসেন
আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো—সন্তান। আমরা চাই সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আলোয় আলোকিত হোক, সফলতার শিখরে পৌঁছাক। কিন্তু এই শ্রেষ্ঠত্বের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে গিয়ে, আমরা কি অজান্তে তাদের সেই মূলের বাঁধন থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছি, যার ওপর ভর করে মানুষ মাটি কামড়ে দাঁড়িয়ে থাকে? আমরা কি তাদের এমন এক 'বনের পাখি' হিসেবে তৈরি করছি, যারা ডানা মেলার পর আর নীড়ে ফিরে আসার প্রয়োজন বোধ করবে না?
শেকড়হীনতার বীজ: উপেক্ষিত সম্পর্ক
আজকের দিনে আমরা একটি ভুল ধারণা পোষণ করি—দাদা-দাদী, নানা-নানীর কাছে সময় কাটানো মানে সময়ের অপচয়। আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক গড়ার সুযোগ করে দেওয়াটাকে আমরা গুরুত্ব দেই না, কারণ আমাদের কাছে মনে হয় এতে পড়ালেখার ক্ষতি হচ্ছে।
কিন্তু এর ফল কত মারাত্মক, তা আমরা বুঝি না। যখন একটি শিশু তার মূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, সে শুধু পরিবার নয়, নিজের আত্মপরিচয় এবং দায়িত্ববোধ থেকেও দূরে সরে যায়। এই বিচ্ছিন্নতা তার হৃদয়ে জন্ম দেয় এক ধরনের শূন্যতা, যার ফলস্বরূপ:
মমতার বাঁধন আলগা হয়: নিজের জন্মদাতার প্রতিও তার মায়া ও মমতা কমে যেতে থাকে।
দায়িত্বের প্রতি উদাসীনতা: সে নিজের কর্তব্য বা দায়বদ্ধতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে ওঠে।
ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি: সে যেহেতু সম্পর্কের গভীরতা দেখেনি, তাই সে একদিন তার সন্তানকেও অনুরূপ বিচ্ছিন্নতাই উপহার দেবে।
ননীর পুতুল আর ফলাফল-মেশিন
সন্তানকে মানুষ করতে গিয়ে আমরা প্রায়শই দুই ধরনের মারাত্মক ভুল করি। একদিকে, অতিরিক্ত আদর-যত্ন আর বিলাসের মধ্যে রেখে তাকে করে তুলি 'ননীর পুতুল'—যে জীবনে সামান্যতম কষ্ট বা সংগ্রাম ছাড়া আর কিছুই বোঝে না, নিজের আরাম-আয়েশই যার কাছে একমাত্র গুরুত্বের বিষয়।
অন্যদিকে, আমরা সমাজ, ধর্ম, আর নৈতিকতার শিক্ষা বাদ দিয়ে শুধু ভাল ফলাফলের দিকেই জোর দিই। আমরা চাই আমাদের সন্তান হোক একটি 'পরীক্ষার যন্ত্র'। কিন্তু বিবেক, নৈতিকতা আর ন্যায়নিষ্ঠা ছাড়া অর্জিত এই জ্ঞান আসলে এক শূন্য মানবতা। এই ফলসর্বস্ব শিক্ষা একদিন ভয়ংকর পরিণতি নিয়ে আসে।
যখন পাখি ডানা মেলে: বৃদ্ধাশ্রমের প্রতীক্ষা
আজ আমাদের সমাজে অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যেখানে বাবা-মা কঠোর পরিশ্রম করে সন্তানকে উচ্চশিক্ষা দিয়ে দেশের বাইরে পাঠিয়েছেন বা দেশে বড় চাকরিতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অথচ দিনশেষে তাঁদের নিজেদের ঠাঁই হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে।
আমার কাছে মনে হয়, এ যেন সত্যিই বনের পাখির জন্ম দেওয়া—যে পাখি বড় হয়, শক্তিশালী ডানা মেলে, কিন্তু তার এই উড়াল শুধুমাত্র নিজের আকাশ ছোঁয়ার জন্য। যে মুহূর্তে সে উড়তে শেখে, সে নীড়কে ভুলে যায়। আমরা হয়তো তাদের কাছ থেকে আর্থিক নির্ভরতা চাই না, কিন্তু সেই সন্তানের ভালোবাসা, সঙ্গ আর মানবিক দায়িত্ব কি আমাদের প্রাপ্য নয়?
প্রত্যাশার আলো
আসুন, আমরা আমাদের সন্তানদের শুধু 'সফল' নয়, 'মানুষ' হিসেবে গড়ে তুলি। তাদের শিক্ষায় যেন থাকে বিবেক, নৈতিকতা, সততা, আর ন্যায়নিষ্ঠার ভিত্তি।
এই প্রত্যাশা রইল যে, আমাদের সবার ঘরে নেক সন্তানের জন্ম হোক—যারা নিজেদের শেকড়কে সম্মান করবে, বাবা-মা এবং পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে এবং নৈতিক মূল্যবোধে আলোকিত হবে। এমন সন্তানই আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ।

Comments
Post a Comment