"গতস্য শোচনা নাস্তি" – সামনে চলার পথে অতীতকে সঙ্গী করে
মোঃ শাহাদৎ হোসেন
"গতস্য শোচনা নাস্তি" - এই একটি সংস্কৃত উক্তি, যার অর্থ "যা ঘটে গেছে, তার জন্য অনুশোচনা নেই"। এই কথাটি কেবল একটি উপদেশ নয়, বরং জীবন চলার পথের এক গভীর দর্শন। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির মতো বৃহৎ ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব অপরিসীম।
ব্যক্তিগত জীবনে মুক্তির মন্ত্র
আমরা মানুষ হিসেবে প্রায়শই আমাদের অতীতকে এক বিশাল বোঝা হিসেবে বয়ে বেড়াই। অতীতের ভুল, ব্যর্থতা, কিংবা অপূর্ণতা যেন আমাদের বর্তমানের প্রতিটি পদক্ষেপে শেকল পরিয়ে রাখে। কেউ হয়তো একটি খারাপ সম্পর্ককে, কেউ বা একটি বড় আর্থিক ক্ষতির স্মৃতিকে, আর কেউ হয়তো এক ভুল সিদ্ধান্তকে আঁকড়ে ধরে থাকি। আমরা অতীতকে এমনভাবে দেখি যেন অতীতই আমাদের সব, আমাদের পরিচয়ের শেষ কথা।
কিন্তু সত্য হলো, অতীত কেবল একতাল স্মৃতি নয়, এটি হলো এক মূল্যবান শিক্ষকের ভান্ডার। আমাদের অবশ্যই অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে—কোন পথে এগোলে হোঁচট খেতে হয় না, কোন অভিজ্ঞতা আমাদের শক্তিশালী করেছে। তবে, সেই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের সামনে আগাতে হবে।
অতীত একটি গাড়ির রিয়ার-ভিউ মিররের মতো—তাতে দেখতে হয়, কিন্তু সেখানে তাকিয়ে থাকলে পথ চলা যায় না। আপনার নাম (বা আমার নাম) যাই হোক না কেন, আমাদের জীবনের নতুন অধ্যায় তখনই শুরু হবে, যখন আমরা বুঝব: অতীত সবকিছু নয়। বর্তমান এবং ভবিষ্যৎই আমাদের কর্মক্ষেত্র।
জাতীয় রাজনীতিতে "অনুশোচনা নেই" এর আবশ্যকতা
জাতীয় জীবনের প্রেক্ষাপটে "গতস্য শোচনা নাস্তি" উক্তিটি আজ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি, বাংলাদেশ, যখন বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে পাল্লা দিয়ে উন্নয়নের মহাসড়কে ছুটতে পারে, তখন আমরা প্রায়শই এক অদ্ভুত চক্রে আটকে যাই।
আমরা দেখতে পাই, দেশের উন্নয়নের জন্য সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, বা শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে যতটা না আলোচনা হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগ দেওয়া হয় অতীতকে অমীমাংসিত করার বা পুনঃ-আলোচিত করার কাজে।
মুক্তিযুদ্ধ, চেতনা, স্বাধীনতার ঘোষণা, নামকরন, নাম পরিবর্তন, পুননামকরণ—ইত্যাদি বিষয়গুলো নিঃসন্দেহে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের ভিত্তিপ্রস্তর। কিন্তু এগুলোকে নিয়ে অনবরত কলহ, বিতর্ক, এবং এসবের পেছনে বিপুল অর্থ ও সময় ব্যয় করা কি আমাদের এখনকার প্রধান কাজ?
আমরা যখন দেখছি বিশ্বের অন্যান্য দেশ এগিয়ে যাচ্ছে নতুন প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ আর নাগরিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে, তখন আমরা যদি এখনও শুধু "কে বড়, কে ছোট", "কে বলেছিল, কে বলেনি"—এই ধরনের তর্কে ডুবে থাকি, তবে জাতি হিসেবে আমরা পিছিয়ে পড়ব।
এসব কলহে জড়িয়ে আমরা আসলে দেশের প্রধান প্রধান সমস্যা সমাধানে নজর দিতে পারছি না। দেশের প্রধান প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে - বেকারত্ব, দুর্নীতি, স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইত্যাদি। এসবের সমাধানে মনোযোগ দেওয়া এখন অপরিহার্য।
সামনে চলার পথ
জাতীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে এই উপলব্ধির জন্ম দিতে হবে যে, আমাদের পূর্বপুরুষেরা যা করেছেন, তা ইতিহাস। সেই ইতিহাস থেকে আমরা অনুপ্রেরণা নেব, স্বাধীনতা অর্জনের মূল্য বুঝব, কিন্তু তাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে আজকের দিনের কাজ ফেলে রাখব না।
অতীতে যা ঘটেছে, তার জন্য অনুশোচনা করে বা তা নিয়ে চিরন্তন বিতর্কে জড়িয়ে থেকে আমরা বর্তমানের সম্ভাবনাগুলো নষ্ট করতে পারি না। আমাদের মনন, মেধা এবং সমস্ত শক্তিকে এখন কাজে লাগাতে হবে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে, প্রতিটি নাগরিকের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে।
"গতস্য শোচনা নাস্তি"—হ্যাঁ, অতীত চলে গেছে, এখন অনুশোচনা নয়। এখন সময় এসেছে অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে সেই শিক্ষাকে ভবিষ্যতের উন্নয়নে বিনিয়োগ করার। আসুন, আমরা সকলে মিলে এইসব বিষয় ভেবে দৃঢ় পদক্ষেপের সাথে সামনের দিকে আগাতে থাকি।
’সুখ কোথায়’ মোঃ শাহাদৎ হোসেন সুখ! এ এক মায়াবী শব্দ, যার সন্ধানে আজীবন ছুটে চলেছি আমরা। জীবনের প্রতিটি বাঁকে এই একটি জিনিসেরই খোঁজ — কীভাবে সুখী হওয়া যায়, কী করলে শান্তি মেলে? আমাদের প্রচলিত ধারণা হয়তো এটাই যে, সুখ অর্জনের জন্য চাই অফুরন্ত সম্পদ। হ্যাঁ, জীবনধারণের জন্য পরিমিত সম্পদ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই 'পরিমিত' শব্দটি যেন কখন হারিয়ে যায়! সম্পদ আহরণের এই নেশা যখন মরিয়া হয়ে ওঠে, তখন তা আর প্রয়োজন থাকে না, জন্ম দেয় এক ভয়ংকর প্রবণতার – লোভের। এই অতিরিক্ত আয় আর সম্পদ লাভের আশায় মানুষ দিন রাত নিরন্তর পরিশ্রম করেছে, নিজের স্বাস্থ্য আর সম্পর্ককে করেছে অবহেলা। আর জীবনের শেষে কী হয়? অর্জিত সম্পদের একটা বড় অংশই ব্যয় করতে হয় অসুস্থ হয়ে কাল কাটাতে। লোভ এক অতৃপ্ত ক্ষুধা, যা কখনোই মেটে না। আর এই লোভই মানুষকে অন্ধ করে দেয়। তখন সম্পদ অর্জনের পথটি আর সৎ থাকে না, তা মানুষকে ঠেলে দেয় অনৈতিকতার দিকে, পাপের পথে। আমরা ভুলে যাই যে, লক্ষ লক্ষ টাকা বা বস্তুর স্তূপ হয়তো ক্ষণিকের তৃপ্তি দিতে পারে, কিন্তু তা কখনোই মনের স্থায়ী শান্তি এনে দিতে পারে না। দুঃখের বিষয়, যাদের সম্...

Comments
Post a Comment